ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতির পর লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের প্রত্যাবর্তন বিষয়ে আশাবাদী হয়ে উঠেছিল শিপিং কোম্পানিগুলো। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা দখলের প্রস্তাব তাদের মাঝে নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে। প্রতিক্রিয়ায় শিপিং কোম্পানির নির্বাহীরা এক বছরের বেশি সময় পর লোহিত সাগরের রুট স্বাভাবিক হওয়ার পথে এগোচ্ছে, সে প্রত্যাশা নষ্ট হয়ে গেছে। ইয়েমেনের হুথি সশস্ত্র গোষ্ঠী বাণিজ্যিক জাহাজে ফের হামলা শুরু করতে পারে। গত মাসে পক্ষটি জানিয়েছিল, ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতির পর তার লক্ষ্যবস্তু কমিয়ে এনেছে। খবর এফটি।
পণ্য পরিবহন গ্রুপ নর্ডেনের প্রধান নির্বাহী জান রিন্ডবোর মতে, ট্রাম্পের পরিকল্পনা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতিকে আরো বাড়িয়ে তুলবে, যা লোহিত সাগর সংকটকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। ট্রাম্পের ঘোষণার পর হুথিরা হয়তো আর বসে থাকবে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের গাজা প্রস্তাব বাণিজ্য ও শিপিং শিল্পের জন্য অস্থিরতা তৈরির পাশাপাশি সমুদ্র বাণিজ্যে সামগ্রিক অনিশ্চিত দৃষ্টিভঙ্গি বাড়িয়ে দিয়েছে। হোয়াইট হাউজে প্রবেশের প্রারম্ভিক দিনগুলোয় তিনি একাধিক বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। এতে জাহাজ মালিকদের মধ্যে আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা কিনা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে মন্থর পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় সর্বাত্মক হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এতে প্রতিদিন হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়। ওই বছরের শেষ দিকে ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে ইসরায়েল অভিমুখী সব জাহাজে হামলার হুমকি দেয় হুথিরা। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন জাহাজকেও লক্ষ্যবস্তু করেছিল। এরপর একে একে প্রধান সব শিপিং কোম্পানি লোহিত সাগর এড়িয়ে চলে এশিয়া থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহনে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপের পথ বেছে নেয়। এতে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ে। একই সময়ে মিসরের সুয়েজ খালের আয় প্রায় তলানিতে ঠেকে।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর গত ১৯ জানুয়ারি হুথিদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা ইসরায়েল বা পুরোপুরি ইসরায়েলি মালিকানাধীন জাহাজ ছাড়া সব নৌযানের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে। ফলে ইয়েমেন উপকূল হয়ে শিপমেন্ট কিছুটা বাড়ে।
লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের তথ্যানুযায়ী, ১৯ জানুয়ারির পর থেকে ইয়েমেন উপকূলের মধ্য দিয়ে বাব-এল-মানদেব প্রণালি হয়ে ট্রানজিট ৪ শতাংশ বেড়ে ২২৩ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৫টি জাহাজ ছিল, যেগুলো ২০২৩ সাল থেকে এ অঞ্চলে চলাচল করেনি বা এর আগে এ পথে যায়নি।
পণ্য পরিবহন বিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণী সংস্থা আইসিআইএসের তথ্য অনুসারে, একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ক্যারিয়ার সম্প্রতি ওমান ছেড়েছে। যেটি কিনা এক বছরেরও বেশি সময় পর লোহিত সাগর হয়ে প্রথমবার রুশ নয় এমন এলএনজি কার্গো পরিবহন করছে। সালালাহ এলএনজি নামের এ জাহাজ ১৬ ফেব্রুয়ারি তুরস্কের বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছে দিতে জাহাজটিকে লোহিত সাগর হয়ে যেতে হবে।
লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের মেরিটাইম রিস্ক অ্যানালিস্ট ব্রিজেট ডায়াকুন বলেছেন, অল্প কিছু জাহাজ লোহিত সাগর রুটে ফিরে এসেছে। তবে অন্য জাহাজগুলো স্থিতিশীলতার আরো প্রমাণের জন্য এখনো অপেক্ষা করছে।
অনেক জাহাজ মালিক মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বাড়বে। আক্রমণ সীমিত করার প্রতিশ্রুতি থেকে হুথিরা সরে আসতে পারে। এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন তারা।
ভেসপুচি মেরিটাইমের প্রধান নির্বাহী লার্স জেনসেন বলেন, ‘লোহিত সাগর রুটে ফেরার প্রারম্ভিক আশা ভেঙে গেছে। এক সপ্তাহ আগে এ প্রত্যাশা দেখা দেয়। কিন্তু এখন লোহিত সাগরে ফেরার সম্ভাবনা কমে গেছে।’
নর্ডেনের প্রধান নির্বাহী বলেছেন, ‘লোহিত সাগত দুই মাসের মতো শান্ত থাকার পর ট্রানজিট বাড়তে পারে। কিন্তু অঞ্চলটি স্থিতিশীল থাকবে কিনা ট্রাম্পের ঘোষণা সে সম্পর্কে আস্থা জাগাতে সাহায্য করছে না।’
বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা জানান, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে লোহিত সাগর রুটের ওপর বিধিনিষেধে ভুগেছেন তারা। দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথের বদলে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন।
ডেনিশ কনটেইনার শিপিং গ্রুপ এপি মোলার-মায়েরস্ক গত সপ্তাহে পূর্বাভাসে বলেছিল, লোহিত সাগর হয়ে বাণিজ্য চলতি বছরের মাঝামাঝি চালু হতে পারে। আবার এ বন্ধ থাকার সর্বোচ্চ ক্ষতি ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে। যদি বছরের মাঝামাঝি চালু হয়, তবে ক্ষতি ছাড়াই ২০২৫ সাল পার করতে পারবে কোম্পানিটি। নইলে অপারেটিং মুনাফা ৩০০ কোটি ডলারে সংকুচিত হবে।
এ বিষয়ে কোম্পানিটি প্রধান নির্বাহী ভিনসেন্ট ক্লার্ক বলেন, ‘সুয়েজে ফিরে যাওয়া এতটা জটিল যে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে শুধু কয়েক মাসের জন্য ফিরে যাচ্ছি না। গ্রাহকরা বারবার রুট পরিবর্তনের মতো অস্বস্তিকর অবস্থা চায় না।’
মায়েরস্ক ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে লোহিত সাগর রুটে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। তবে হুথি বিদ্রোহীরা জাহাজে গুলি চালিয়ে দখলের চেষ্টার পর শিপমেন্ট রিরুট করতে বাধ্য হয়। ভিনসেন্ট ক্লার্ক আরো বলেন, ‘যতদিন না এটি স্পষ্ট হয় যে কয়েক সপ্তাহ পর পরিস্থিতি কেমন হবে, ততদিন আমরা অপেক্ষা করব।’